মায়ের ডাক — গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক গণ-প্রতিবাদের পথচলা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “গুম” শব্দটি কেবল একটি অপরাধের সংজ্ঞা নয়; এটি একেকটি ভাঙা পরিবার, অসহায় মা-বাবা, চোখ ভরা অপেক্ষা আর এক অনন্ত যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবচেয়ে ঐতিহাসিক প্ল্যাটফর্ম হলো “মায়ের ডাক”। এই আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে ধাপে ধাপে বিকাশ, সংগ্রাম, প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিধ্বনিত হওয়ার ধারাবাহিকতা আজ দেশের ইতিহাসের অমোচনীয় অধ্যায়। যাত্রা শুরু: ৮ পরিবার নিয়ে এক লড়াই। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর। তেজগাঁও থানার সাবেক ৩৮ বর্তমান ২৫ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর প্রার্থী সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ মোট ৮ জনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। মাত্র ৬ দিন পর ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। এর আগে একইভাবে র্নিঘোষিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রিয় কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী ও তাঁর ড্রাইভার আনসার আলী। এই ভয়ঙ্কর গুমের ধারায় রীতিমতো আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়ে শহর ও রাজনীতি। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিরোধী দলও প্রতিবাদ করতে সাহস পেত না সেই সময়। প্রথম প্রতিবাদ: প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন। গুমের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ আয়োজন করে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনের নেতৃত্বে ছিলেন সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা। উপস্থিত ছিলেন: জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ গুম হওয়া ৮ জনের ছবি দিয়ে ব্যানার তৈরির নেতৃত্ব, কর্মসূচির প্রস্তুতি ও গণমাধ্যম প্রচার করেন মঞ্জুর হোসেন ঈসা। গুমের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বড় হতে থাকে গুম হওয়া পরিবারও, ২০১৪ সালে প্রেসক্লাবের সামনে আবারও মানববন্ধন হয়—এবার নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে। ৪ ডিসেম্বর ২০১৪-তে গুমের এক বছর পূর্তিতে হাজেরা খাতুনের সভাপতিত্বে গুম হওয়া সুমনসহ প্রথম ৮ পরিবারের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ পরিবারে। নেতৃত্বে ছিলেন হাজেরা খাতুন (সুমনের মা), আফরোজা ইসলাম আঁখি, সানজিদা ইসলাম তুলি, এভাবেই শুরু হয় “মায়ের ডাক” নামের ঐতিহাসিক আন্দোলন। মায়ের ডাক কেবল বিএনপি বা ছাত্রদল–যুবদলের পরিবার নয়। এখানে যুক্ত হয়েছেন জামাত-শিবিরের নেতাকর্মীদের পরিবার, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কুষ্টিয়ার সাজ্জাদ হোসেন সবুজ, ঢাকা রামপুরা ছাত্রলীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন তপু, গুমের শিকার সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাষ্ট্রদূত, সাধারণ মানুষ—যেই নিখোঁজ হন তাদের পরিবার এসে দাঁড়ায় এই প্ল্যাটফর্মের পাশে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুমের বিষয়টি পৌঁছে দেন সানজিদা ইসলাম তুলি মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি গুমের তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রতিটি কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতা করেন প্রতিষ্ঠাতা হাজেরা খাতুন, তার পরিবার, এভাবেই ৮ পরিবার থেকে শত-শত পরিবার যুক্ত হয়ে যায় মায়ের ডাক-এ। ২০১৪ সাল থেকে গুমের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হতে থাকে দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, নিউ এজ। তাঁরা একাধিক রিপোর্ট ও ছবিসহ গুমের বিস্তারিত তুলে ধরে। মায়ের ডাক তথ্য সরবরাহ করে ও পরিবারের কাছে সাংবাদিকদের নিয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থান ২৪ জুলাইয়ের অংশগ্রহণ, মায়ের ডাক সরাসরি অংশগ্রহণ করে ২৪ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে। সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে গুম হওয়া সন্তানদের মায়েরা। তাদের সংগ্রামে পাশে দাঁড়ান বিএনপির চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, তাঁদের অবদান স্মরণ করে মায়ের ডাক।, গুম থেকে ফিরে আসা নেতাদের সাক্ষ্য ও সমর্থন, যাঁরা নিজেরাই গুমের শিকার ছিলেন এবং ফিরে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিএনপির মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, গুম থেকে ফিরে আসা হুম্মান কাদের চৌধুরী ও আনিসুর রহমান খোকন, এম ইলিয়াস আলীর পরিবার, চৌধুরী আলমের পরিবারও মায়ের ডাকের আন্দোলনে যুক্ত। গত এক যুগে মায়ের ডাক হারিয়েছে বহু সহযোদ্ধা। অনেক মা-বাবা অপেক্ষার প্রহর শেষে মৃত্যুবরণ করেছেন। আন্দোলন আরও শক্ত হয়েছে প্রতিটি মৃত্যু দিয়ে। তারেক রহমানের প্রতি মায়ের ডাকের কৃতজ্ঞতা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিয়মিত গুমের পরিবারগুলোর খোঁজ নিয়েছেন, সাহস, সান্ত্বনা ও সহযোগিতা দিয়েছেন এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর প্রত্যাশিত ফল না পেলেও আশার আলো দেখা যায় যখন সানজিদা ইসলাম তুলি ঢাকা-১৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী মনোনীত হন। মায়ের ডাক বিশ্বাস করে তিনি জাতীয় সংসদে গুমের শিকার পরিবারের কথা তুলে ধরবেন। ঐতিহাসিক দুটি দিন: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ও ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫। তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের দিন। মায়ের ডাক রাজপথে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ মায়ের ডাকের সবচেয়ে কষ্টের দিন ১৮ কোটি মানুষের মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। মায়ের ডাক তাঁর জানাজা ও দোয়ায় অংশ নেয়। ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান মায়ের ডাক পরিবারের সদস্যদের বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। এ দিনটি মায়ের ডাক পরিবারে “শ্রেষ্ঠ দিন” হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকে। “মায়ের ডাক” এখন শুধু একটি মানবাধিকার প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি এক ঐতিহাসিক আন্দোলন, এক মায়ের শোক থেকে জন্ম নেওয়া সাহস, এক গণ-প্রতিরোধের নাম। এই সংগঠন গুমের শিকার পরিবারদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, আন্তর্জাতিক প্রচার, গণমাধ্যম যোগাযোগ, প্রতিবাদ কর্মসূচি, সবকিছুতে নেতৃত্ব দিয়েছে। ৮ পরিবার থেকে শুরু হয়ে আজ শতশত পরিবারের হৃদয়ের ভরসা মায়ের ডাক।
মো.মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
এবং মায়ের ডাক
