টিন-এক্স: সচেতনতার গণ্ডি পেরিয়ে তরুণদের নিরাপত্তায় ১৭ বছর বয়সী সামাজিক উদ্যোক্তা শাহী আল সাদাত
অনলাইন ও অফলাইনে তরুণদের নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার প্রবণতা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন ১৭ বছর বয়সী সামাজিক উদ্যোক্তা শাহী আল সাদাত প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য শুধু প্রচলিত সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কোনো কিশোর-কিশোরী বিপদের মুখে পড়লে তাকে বাস্তব ও কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা।
সাদাত কয়েক বছর ধরে ‘টিন-এক্স’ (Teen-X) নামের একটি উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি, যৌন সহিংসতা, মানবপাচার এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছেন।
সাদাত বলেন, “সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটিই শেষ ধাপ হতে পারে না। কোনো তরুণ যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন তার এমন একজন—অথবা এমন কোনো ব্যবস্থা—প্রয়োজন, যা সেই মুহূর্তে সাড়া দিতে পারে।”
এই দর্শনই টিন-এক্সের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। উদ্যোগটির বিভিন্ন কার্যক্রমে জরুরি সতর্কবার্তা, অবস্থানভিত্তিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হয়েছে। পাশাপাশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালনা করা হয়েছে।
টিন-এক্সের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, কোনো কিশোর-কিশোরী যখন নিজেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখতে পায়, তখন তার জন্য সহজে সহায়তা চাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠায় সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন শোষণের বিষয়েও টিন-এক্স কাজ করছে।
তবে সাদাত মনে করেন, প্রযুক্তি সমাধানের কেবল একটি অংশ।
তাঁর মতে, তরুণদের শুধু নিরাপত্তা কার্যক্রমের সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং তাদের নিজেদের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে এমন সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে টিন-এক্স শুধু অনলাইন প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সরাসরি তরুণদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
টিন-এক্সের এমনই একটি কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় রংপুর মেডিকেল কলেজে, যেখানে তরুণদের নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক বিষয় নিয়ে একটি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সাদাতের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; অথচ যেসব এলাকায় বাস্তব সহায়তার প্রয়োজন, সেখানে এই আলোচনা পৌঁছানোও জরুরি।
বিগত বছরগুলোতে সাদাত বিভিন্ন প্রচারণা ও তরুণদের নিয়ে পরিচালিত কর্মসূচিতে সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও কাজ করেছেন। প্রযুক্তি, নেতৃত্ব ও সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মনোনয়ন ও পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতিও পেয়েছে।
তবে এই স্বীকৃতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সাদাত মনে করেন—তরুণরা যখন সত্যিই বিপদের মধ্যে পড়ে, তখন তারা কতটা সহজে সহায়তা পেতে পারে।
তরুণদের সম্পৃক্ততার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বিতর্ক ও স্কুলভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে সেই আগ্রহ প্রযুক্তি ও সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমে বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে তিনি তরুণদের জীবনকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রকল্প তৈরি শুরু করেন, যার ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে টিন-এক্স।
টিন-এক্সের কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হলো অ্যাডভোকেসি বা অধিকারভিত্তিক প্রচেষ্টা, প্রযুক্তি, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক সহায়তার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। উদ্যোগটির কার্যক্রম এখনো বিকশিত হচ্ছে। তবে এর মূল দর্শন খুবই সরল—প্রতিরোধমূলক সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কিশোর-কিশোরীরা শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য যত বেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, একই সঙ্গে তারা এসব প্ল্যাটফর্মে হয়রানি, শোষণ, ভুল তথ্য ও বিভিন্ন ধরনের হুমকিরও মুখোমুখি হচ্ছে।
তাই টিন-এক্সের মতো উদ্যোগগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু তরুণদের কোন বিপদগুলো এড়িয়ে চলতে হবে তা জানানো নয়; বরং তারা বিপদের মুখে পড়লে যাতে সহজে সহায়তা চাইতে পারে, সেই সহজলভ্য ও কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যম তৈরি করাও।
১৭ বছর বয়সে সাদাত এখনো তাঁর পথচলার একেবারে শুরুতে। তবে টিন-এক্সের মাধ্যমে তিনি তরুণদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের একটি বিস্তৃত ধারণা সামনে আনছেন—যেখানে সামাজিক উদ্যোক্তার কাজ কেবল সচেতনতা তৈরির মধ্যেই শেষ হয় না।
বরং তাঁর মতে, প্রচারণা শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় আরও কঠিন দায়িত্ব—যখন কোনো তরুণ সত্যিকার অর্থে সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করে, তখন তার পাশে দাঁড়ানো।