মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগদান: জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার সাহসী পরীক্ষা; মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও দূরদর্শী, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সৃষ্টি করেছে। চুক্তির মূল ধারণা হলো যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। চুক্তির পক্ষগুলো বলেছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্প, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও যৌথ নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু ‘জোটে যোগ দেওয়া হবে কি না’—এতটুকু নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে?
মক্কা চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুরস্কের পক্ষ থেকে এটিকে ন্যাটোর Article 5-এর সঙ্গে কারিগরিভাবে তুলনা করা হয়েছে—অর্থাৎ কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সম্মিলিত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা রয়েছে। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ, সামরিক কাঠামো ও প্রতিশ্রুতির বিস্তারিত এখনও বিকাশমান।
তুরস্কের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তিটি যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ প্রকল্প এবং সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, চুক্তিটি কোনো দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কামনা করা দেশগুলোর অংশগ্রহণের জন্য এটি উন্মুক্ত।
এই কারণেই বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানের দেশের জন্য বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছাকাছি অবস্থান বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে।
দেশের নিরাপত্তা এখন শুধু স্থলসীমা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রসীমা, সাইবার নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সবই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
মক্কা চুক্তির অন্যতম আলোচিত দিক হচ্ছে প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা। তুরস্ক ইতোমধ্যে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্পে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামোয় স্থল, নৌ, আকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রে যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ যদি সুপরিকল্পিতভাবে এমন সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তাহলে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন দরজা খুলতে পারে।
আত্মবিশ্বাসী প্রতিরক্ষা নীতি প্রয়োজন
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং যুদ্ধ প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বাস্তবতায় শুধু জনবল দিয়ে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা।
এই জায়গায় সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।
তবে সহযোগিতা মানেই অন্ধভাবে কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নয়। বরং বাংলাদেশের উচিত হবে—নিজের প্রয়োজন, নিজের নিরাপত্তা এবং নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা নিরাপত্তার সম্পর্ক আছে
জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।
একটি দেশের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি সরবরাহ, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নও টেকসই হয় না।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী কর্মী রয়েছেন। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তাই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু সামরিক প্রশ্ন নয়; এটি শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
তবে জোটে যোগদানের আগে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে
মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নীতি হওয়া উচিত—কোনো দেশের শত্রুতাকে বাংলাদেশের শত্রুতা হিসেবে গ্রহণ না করা।
কারণ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে নয়; ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
একটি সামরিক জোটে প্রবেশের ফলে যদি বাংলাদেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্যও দিতে হতে পারে।
সম্প্রতি বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
সুতরাং সিদ্ধান্ত হতে হবে আবেগ দিয়ে নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশ দিয়ে।
সংবিধানই হোক পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি সম্মান, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলে।
অতএব, মক্কা জোটে যোগদানের প্রশ্নেও বাংলাদেশের প্রথম বিবেচনা হতে হবে সংবিধান ও জাতীয় স্বার্থ।
বাংলাদেশ কোনো শক্তির অনুসারী রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশকে হতে হবে নিজের স্বার্থের রাষ্ট্র।
বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে—কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন।
তারেক রহমান সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানের নতুন পরীক্ষা
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন নতুন ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়।
ভারত প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য তাড়াহুড়া নেই এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রগতি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্ক চায়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করবে না।
এটি সরাসরি ‘ভারতের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে বর্ণনা করার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক সময় নির্বাচন হিসেবে দেখা অধিক তথ্যনির্ভর।
এমন অবস্থান বাংলাদেশের কূটনীতিতে আত্মমর্যাদার বার্তা দিতে পারে—যদি তা একই সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী ও দীর্ঘমেয়াদি হয়।
হুমায়ুন কবিরের সামনে বড় দায়িত্ব
সম্প্রতি হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী তিনি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিষয়, অনাবাসী বাংলাদেশিসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্পিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখবেন।
এই দায়িত্ব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের সামনে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, মক্কা চুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য, রোহিঙ্গা সংকট, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার—সব ক্ষেত্রেই দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবিরকে তাই শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তাঁকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা দেখা দিলে তার মোকাবিলা করতে হবে তথ্য, যুক্তি, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের মাধ্যমে। একই সঙ্গে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
ঘরের শত্রু বিভীষণ—কিন্তু ‘শত্রু’ চিহ্নিতকরণে সতর্কতা জরুরি
জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে রক্ষা করা যায় না। রাষ্ট্রের ভেতরে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ, মাদক, সাইবার অপরাধ, বিদেশি অর্থায়নের অপব্যবহার, গুজব, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
সরকারের সমালোচনা করা, প্রশ্ন করা কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক মত প্রকাশ করা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। প্রকৃত ষড়যন্ত্র, সহিংসতা, রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ বা বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ হলে তা অবশ্যই আইনসম্মত তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে।
জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি হলো—আইনের শাসন।
জুলাইয়ের চেতনা, ৫২, ৬৯ ও ৭১—সব সংগ্রামের শিক্ষা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা কোনো একটি দিনের সৃষ্টি নয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের শক্তি দেখিয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইতিহাস।
আর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে।
এই সব সংগ্রামের মূল শিক্ষা একটাই—মানুষের অধিকার, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার রক্ষা করতে হবে।
তাই নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি এমন হওয়া উচিত, যেখানে অতীতের কোনো ত্যাগকে দলীয় সংকীর্ণতার কারণে অস্বীকার করা হবে না।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর কান্নাও রাষ্ট্রের বিবেক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুম, নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ একটি গভীর মানবিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের আকুতি রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দেয়।
জাতীয় নিরাপত্তা কখনো মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
বরং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে সেনাবাহিনী শক্তিশালী, সীমান্ত নিরাপদ, অর্থনীতি শক্তিশালী—এবং একই সঙ্গে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদাও সুরক্ষিত।
এই জায়গায় মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে তারা পরস্পরের পরিপূরক।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কৌশল কী হতে পারে?
মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পথ খোলা রয়েছে।
প্রথমত, তাৎক্ষণিক আবেগে পূর্ণ সদস্যপদ না নিয়ে বিস্তারিত কৌশলগত পর্যালোচনা করা।
দ্বিতীয়ত, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে দেখা।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রতিশ্রুতি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা।
চতুর্থত, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে বহুমুখী কূটনীতি বজায় রাখা।
পঞ্চমত, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প, শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও গভীর করা।
ষষ্ঠত, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ১৯৭১-এর ইতিহাস, জাতীয় মর্যাদা ও বাংলাদেশের স্বার্থকে যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখা।
সপ্তমত, যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আগে সংসদ, বিশেষজ্ঞ, সামরিক কৌশলবিদ, অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের মতামত নেওয়া।
সাহসী সিদ্ধান্ত মানেই হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন সাহসী পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত আর হঠকারী সিদ্ধান্ত এক নয়।
সাহসী সিদ্ধান্ত হলো—জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদায় কথা বলা।
সাহসী সিদ্ধান্ত হলো—নিজের সীমান্ত, সমুদ্রসীমা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা।
সাহসী সিদ্ধান্ত হলো—কোনো বিদেশি শক্তির চাপের কাছে নত না হওয়া।
আবার সাহসী সিদ্ধান্ত হলো—নিজের ভুল স্বীকার করে প্রয়োজন হলে নীতি সংশোধন করা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।
মক্কা জোটে যোগ দিলে কী বার্তা যাবে?
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত হবে না; এটি একটি বড় ভূরাজনৈতিক বার্তাও হবে।
তাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এর বিপরীতে ভারতসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু বহির্বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, তাই প্রতিটি সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবও করতে হবে।
সুতরাং সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হওয়া উচিত—
মক্কা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, আর কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে?
জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সেনাবাহিনী নয়, জনগণ।
দেশের জনগণ যদি বিভক্ত থাকে, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দুর্বল থাকে এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি পরস্পরকে শত্রু মনে করে, তাহলে কোনো আন্তর্জাতিক জোটই একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করতে পারে না।
তাই দলাদলি, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, ভাষা আন্দোলনের চেতনা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং গুম-নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতির মানবিক ভিত্তিতে পরিণত করতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময় অতিক্রম করছে, যখন পুরোনো কূটনৈতিক হিসাব দিয়ে নতুন বিশ্বের মোকাবিলা করা কঠিন।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে—কিন্তু সেই সম্ভাবনা গ্রহণ করতে হবে চোখ খোলা রেখে, মাথা উঁচু করে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হোক।
বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হোক।
বাংলাদেশের কূটনীতি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ হোক।
বাংলাদেশের জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হোক।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকুক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে কীভাবে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যে রাষ্ট্র কারও বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু নিজের স্বার্থের প্রশ্নে কারও কাছে নত নয়।
মক্কা জোটে যোগদান শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হবে কি না—তার উত্তর নির্ধারণ করবে সময়, কূটনৈতিক আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। কিন্তু এই আলোচনা শুরু হওয়া নিজেই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে এখন আরও সক্রিয়, আত্মবিশ্বাসী ও কৌশলগত হতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হোক—বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, শত্রুতা কারও সঙ্গে নয়; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।


